Aug04

The Symbol of Sun

Stories no responses

প্রতিদিন বাসা থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে বের হওয়া যায় না। সব ধরনের অজুহাত দেওয়া শেষ। আব্বুর কাছে কথা লুকাতে পারলেও আম্মুর কাছে পারা যায় না। সবাই আমাকে এখন সন্দেহ করছে সেটা আমি খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি।

 

অনার্স প্রায় শেষ এর দিকে , আগে প্রাইভেট, ক্লাস, কোচিং এর কথা বলে পার পেয়ে যেতাম কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব নয়। আম্মু তো সেদিন কড়া ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন যে প্রতিদিন বিকেলে আমি কোথায় যাই। সেদিন আম্মুর ফোন এ কল আসায় সে যাত্রায় আমি বেচেঁ গিয়েছিলাম।

 

সবাই ভাবছেন আমি প্রতিদিন কোথায় যাই, তাই তো? আসলে আমাদের বাসা থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের দূরত্বে একটি বস্তি আছে। সেখান কার কিছু অবহেলিত ঝরে পড়া বাচ্চাদের আমি পড়াই। প্রায় ৩০ জন এর মতো আমার ছাত্রছাত্রী। প্রতিদিন আমি বিকেল ৪ টা থেকে ওদের পড়াই। ওদের বাবা মায়ের সামর্থ নেই যে স্কুলে ভর্তি করে দিবে। আমার ছাত্রছাত্রী দের মধ্যে প্রায় সবাই ফুল বিক্রি করে, বাদাম বিক্রি করে, আবার কেউ টং দোকানে কাজ করে। কিন্তু ৪ টার আগেই সবাই এসে হাজির । আমার সব থেকে ছোট ছাত্রীর নাম হলো মিষ্টি। দেখতে একদম রাজকন্যা দের মতো। মাঝে মাঝে ওকে দেখে অবাক হয়ে যাই যে ওর জন্ম এমন একটি পরিবেশে।

 

আমার স্কুল টার নাম হলো আলোর নিশান। ওদের জন্য বই খাতা জোগাড় করা অনেক কস্ট। আমি বিভিন্ন স্কুলের পাঠ্য বই এনে সেগুলো ছাপিয়ে ওদের পড়াই। আর আমার হাত খরচের টাকা দিয়ে খাতা কলম কিনে দেই।

 

সবাই ফ্যামিলি তে কিছু সন্দেহবাতিক আন্টি থাকে, আমার ফ্যামিলি তে ও আছে। আমার প্রতিদিন নিদিষ্ট সময়ে বাইরে যাওয়া নিয়ে তারা নানান কথা বানিয়ে আম্মু কে বলে। আমার স্কুলের কথা কেউ জানে না। আমি ইচ্ছা করেই কাউকে বলি না। আজ প্রায় ২ বছর হলো আমি স্কুল টা চালাই।

 

সেদিন তো এক আন্টি আমার সামনে আম্মু কে বলে বসলো, আমি নাকি আমার লুক্কায়িত প্রেমিক এর সাথে দেখা করতে যাই। আম্মু তার কথা বিশ্বাস না করলেও আমার কথা টা খারাপ লেগেছে। আমি আমার আলোর নিশান দের কথা কারো কাছে বলি না কারন আমি শো অফ বা লোক দেখানো পছন্দ করি না

 

অনার্স প্রায় শেষ এর দিকে। বাসায় অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসে, আব্বু আম্মুর পছন্দ হলেও আমি মানা করে দেই। কারন আমি যেমন মানুষ চাই, তেমন এক জন কেও দেখি নাই। সবার মন মানসিকতা এক নয়। আমি সব ছাড়তে পারবো কিন্তু আমার এই বাচ্চা গুলো কে নয়। আমি আব্বু আম্মুকে বাহানা দিতে দিতে ক্লান্ত।

একদিন স্কুল থেকে বাসায় আসার সময় প্রচুর বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। আমি সেদিন ছাতা সাথে করে নিয়ে যায় নি। আমার স্কুল যেখানে, সেখানে কোন গাড়ি বা রিকশা আসা যাওয়া করে না। যার জন্য পুরো রাস্তা আমি ভিজতে ভিজতে বাসায় চলে আসি।

 

বাসায় আসার পর আমার জ্বর চলে আসে। আর জ্বর এর মাত্রা এতো বেশি ছিলো যে আমাকে বাসার সবাই হাসপাতালে ভর্তি৷ করতে হয়। আমার সুস্থ হতে প্রায় ৭ দিন সময় লাগে।

 

এই ৭ দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমি আমার স্কুলের বাচ্চাদের কথা ভেবেছি। ওদের সাথে আমার এক স্নেহের বন্ধন হয়ে গিয়েছিলো ।

হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর দিন আমি জোর করেই আমার স্কুলে চলে আসি। হাটতে প্রচুর কষ্ট হচ্ছিলো তবুও আমি যাই। স্কুলে গিয়ে দেখি আমার স্কুলের বাচ্চাদের কেউ এক জন পরাচ্ছে।

আমাকে দেখা মাত্র সবাই দৌড়ে চলে আসলো, ছোট্ট মিষ্টি টার সে কি কান্না। সবাই শিফা আপু, শিফা আপু করছিলো।

 

যে ছেলেটি আমার স্কুলে পরাচ্ছিলো সে ও এগিয়ে আসলো, এসে বলল আমি সায়ান। আপনি স্কুলে আসছিলেন না দেখে আমি বাচ্চাদের পরাচ্ছি কয়েক দিন ধরে৷ আমি তাকে ধন্যবাদ দিতেই সে বলল, তা শিফু ম্যাডাম আমার বন্ধু হবেন৷ আমি ও হ্যা করে দিলাম।

সেদিনের মতো ওদের পড়িয়ে বাসায় আসছিলাম আমার সাথে সায়ান ও আসছিলো। সায়ান বলছিলো ও নাকি আমাকে প্রায় দেড় বছর হলো চিনে। প্রতিদিন আমার পিছু পিছু এসে আমার স্কুলের পাশেই বসে থাকতো। তবে আমার সামনে কখনো আসেনি। সে বিসিএস ক্যাডার ভালো চাকরি করে। এত্তো কথা সে এক নাগাড়ে বলে গেলো।

 

সায়ান ও নাকি ছোট বেলা থেকে কষ্ট করেই বড় হয়েছে৷ ওর কথা গুলো আমার খুব ভালো লেগেছে৷ অহংকার হীন ভালো মানুষ।

সায়ান আর আমি খুব ভালো বন্ধু। আমরা এখন ২ জন মিলে স্কুল করি। একদিন আমি আমার আলোর নিশান দের পরাচ্ছিলাম কেউ এক জন সেটা লুকিয়ে লুকিয়ে ভিডিও করে। আর সেটা ফেসবুক, ইউটিউব এ ছড়িয়ে দেয়। ভিডিও তে হাজার হাজার শেয়ার হয়। মোটামুটি একদিনে আমি ভাইরাল,

আমার অজান্তে।

 

তারপর দিন আমি আর সায়ান স্কুলে পরাচ্ছিলাম সেখানে টিভি রিপোর্টার রা এসে হাজির৷ আমাকে নানা প্রশ্ন করা শুরু করলো। আমি তাদের এখানে আসার কারন বা আমার কাজ গুলো কে নিয়ে ভাইরাল করা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তারা এতো প্রশ্ন দিয়ে আমাকে ঘিরে ধরেছিলো যে আমি কি উত্তর দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না৷ সায়ান আমাকে তাদের কাছে থেকে বের করে আনে।

 

সব নিউজ চ্যানেল এ আমাকে নিয়ে রিপোর্ট। আমি কিভাবে স্কুল করছি এই সব নিয়ে। আমার বাবা মা সহ সবাই আমার স্কুল সম্পর্কে জেনে যায়। তাদের মিথ্যা প্রশংসায় আমি জরাজীর্ণ।

 

বাসা থেকে বের হলেই কিছু পাতি ইউটিউবার আমাকে নিয়ে ভ্লগ বানিয়ে চ্যানেলের সাবস্ক্রাইব বাড়াচ্ছে। এমনকি আমার স্কুলের বাচ্চাদের ও জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে কোন ইস্যু পেলেই সেটা নিয়ে মাতামাতি করা হয়। আমার স্কুল নিয়েও হচ্ছিলো। সায়ান এ সময় আমার পাশে ছিলো। পাতি ইউটিউবার দের জন্য আমার স্কুলে আমি পড়াতে পারছিলাম না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে নাহ আমাকে এই সব থামাতে হবেই। আমি পড়াতে গেলাম যথারীতি সাংবাদিক আসলো তারা আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে আমি বললাম, আমার স্কুলের নাম আলোর নিশান ৷ এই স্কুল টা আমি ২ বছর ধরে চালাই। কোন স্বার্থ ছাড়া। এই স্কুল টা নিয়ে আমি একা সংগ্রাম করছিলাম। আর আপনারা কি করছেন নিউজ বানাচ্ছেন নিজেদের চ্যানেল এর টিআরপি বাড়াচ্ছেন। কিন্তু এই কথা টা কি বলেছেন যে সবাই আসুন। খুজে বের করুন এমন আলোর নিশান দের। শিক্ষা পৌছে দিন তাদের কাছে। সবাই মাথা নিচু করে আছেন তার মানে, কেউ কিছু বলেন নি৷ সমাজে কতো সম্পদশালী ব্যক্তি আছে, কেউ কি এগিয়ে এসেছে এদের জন্য কিছু করতে। টিভি সেটের সামনে বসে থাকা আসল বীরত্ব নয়, বাস্তবে কোন কাজ করে দেখানো হলো আসল। আমি লোক দেখানো কাজ চাই না, কিন্তু আপনাদের জন্য এখন আমার কাজ গুলোকে লোক দেখানো বলেই মনে হচ্ছে। তাই সবার কাছে অনুরোধ, আমাকে আর আমার আলোর নিশান দের একা থাকতে দিন।

 

সেদিন থেকে সবার এই বাড়াবাড়ি কমে গিয়েছে। এখন সারা দেশে আলোর নিশান নামক স্কুল আছে। আমাদের মতো স্কুল, কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা পড়ায় এই সব সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের।

 

৫ বছর পর আমার আর সায়ান এর বিয়ে হয়। আর আমাদের বিয়ের অতিথি হিসেবে ছিলো আমার আলোর নিশানের বাচ্চা গুলো। আমাদের একটাই আশা, আমাদের আলোর নিশান গুলো সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। দেশের জন্য ভালো কিছু করবে, শো অফ বা লোক দেখানোর জন্য নয়৷ প্রকৃতপক্ষে দেশের সেবা করার জন্য।

Leave a Reply

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>